সপ্রতি গেল সোমবার ঢাকার চকবাজারে পুলিশের মালিকানধীন একটি কমিউনিটি সেবা কার্যক্রম উদভোদন কালিন সময়ে দেশের আইজিপির বক্তব্যে ক্রসফায়ার শব্দটি প্রকাশ করার ফলে গোটা দেশে বেশ তুলপাড়
এমন উদ্ভট পরিস্থিতি জুলাই অভ্যুত্থান উত্তর বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগের প্রশাসনিক উর্ধতন কর্মকর্তা আইজিপি এর কাছ থেকে দেশ জাতি আশা করেনি বলে আমার বিশ্বাস। কারন আইজিপির এমন বক্তব্যে জাতির পাশাপাশি চায় দেশের সরকারকে ভীষণ বিতর্কিত করেছ। আইজিপি মহোদয় তার বক্তব্যে বলেছেন – ” যদি সরকার তা হলে ক্রসফায়ার করতে আমাদের আপত্তি নেই ” । দেশের আইজিপির এমন বক্তব্যে ফলে দেশের অভ্যন্তরে আইন শৃঙ্খলা ধস পড়ার হৈচৈ শুরু হয়ে পড়েছে তা নয় , দেশের আইন শৃখলা পরিস্থিতি সামলাতে সরকারের চরম আত্বপ্রকাশ নয় কি? বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাষনের আমলে যে ভাবে ক্রসফায়ার কিম্বা এনকাউন্টারের নামে বিরোধী রাজনৈতিক দল দমনের টার্গটে রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার নেতা কর্মীদের যে ভাবে হত্যা করা হয়েছাল তা কি আবারো চালু হতে চলেছে ? যা জনমনে গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
ক্রসফায়ার হচ্ছে বন্দুকযুদ্ধের নামে ” কুখ্যাত অপরাধী বা অপরাধীগন্য কোন ব্যাক্তিকে আইন বহির্ভুত প্রক্রিয়ায় বন্দুকযুদ্ধের নামে গুলি করে হত্যা করা। ক্রসফায়ার মূলত ইংরেজি শব্দ , যার আক্ষরিক অর্থ হলো দুই বা ততোধিক দিক থেকে একই সাথে গুলি ছোড়া । যার ফলে গুলির পথগুলো মাঝপথে একে অপরকে অতিক্রম করে। তবে বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এটি বিশেষ রাজনৈতিক ও আইনি অর্থে বহুল পরিচিত।
আভিধানিক অর্থ — যুদ্ধক্ষেত্র বা গোলাগুলির সময় একাধিক অবস্থান থেকে কোন লক্ষ্যের দিকে এমন ভাবে গুলি চালানো , যাতে গুলির রেখাগুলো একে অপরকে ক্রস করে। এছাড়া রূপক অর্থে কোন উত্তপ্ত তর্কে কিম্বা সিমাহীন দন্ধে দুই পক্ষের মাঝে পড়ে যাওয়াকেও ক্রসফায়ার বলা হয়।
বাংলাদেশ ও উপমাদেশীয় রাজনৈতিক অর্থ —
আইনবহির্ভুত হত্যাকান্ড বোঝাতে এই চরম মানবাধিকার লংঘণ ক্ষেত্রে ক্রসফায়ার শব্দটির বেশ ব্যবহার রয়েছে।
বাংলাদেশে পুলিশ , RAB কিংবা অন্যান্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে থাকা কোন শীর্ষ সন্ত্রাসী , অপরাধী বা সন্ধেহভাজন ব্যাক্তিকে বন্দুকযুদ্ধের নাটকে আলকে বিচারবহির্ভুত ভাবে গুলি করে হত্যা করাকে আমাদের দেশে “ক্রসফায়ার” অথবা “এনকাউন্টার” বলা হয়।
১৯৭৩ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সেই সময়ে নকশাল আন্দোলন দমানোর নামে কলকাতার পুলিশ কমিশনার শ্রী ” রণজিৎ গুপ্ত ” প্রথম এই নিন্দনীয় অমানবিক লংঘণ করে এনকাউন্টার কিংবা ক্রসফায়ারের কৌশলটি ব্যবহার করেছিলেন।
বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ২ জনুয়ারী ক্রসফায়ারে নামে বিচারবিভাগ বহির্ভূত নির্মম হত্যাে শিকার হয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ সিকদার। সিরাজ সিকদার পুর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির অন্যতম নেতা ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারী চট্রগ্রামের নিউমার্কেট এলাকা থেকে সিরাজ সিকদার কে আটক করে দ্রুত হেলিকাপ্টারে করে ঢাকায় এনে ক্রসফায়ার তথা এনকাউন্টারের বিশেষ নাটকিয় ভাবে নির্মমভাবে হত্যাকরে তার মরদেহ ঢাকার সাবার এলাকার তালবাগ নামক স্থানে ফেয়ে রাখা হয়েছিল। ঠিক তার কয়েকদিন পরে তদকালিন জাতিয় সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমান সিংহের গর্জনে হুংকার দিয়ে বলেছিলেন ” কোথায় সিরাজ সিকদার ? বেশী বাড়াবাড়ি করলে লাল ঘোড়া দাবরিয়ে দেবো ” । তখনকার সময়ে সদ্য স্বাধীন স্বর্বভৌম দেশে সর্ব প্রথম ক্রসফায়ারের নামে রাজনৈতিক নিধনের ন্যাক্কারজলক এনকাউন্টারের কর্মকান্ডের রচনা করেছিলেন তখনকার ক্ষমতাশীন দলনেতা শেখ মজিবুর রহমান। শেখ মজিবুর রহমানের আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাষনের আমলে তদকালিন রাজনৈতিক দল জাসদ নিধনের লক্ষে প্রায় ত্রিশ হাজারেরও বেশী নেতা কর্মীদের ক্রসফায়ার ও এনকাউন্টারের নামে নির্মম ভাবে হত্যার শিকার হতে হয়েছিল।
১৯০২ সালে বাংলাদেশের তখনকার পরিস্থিতির নিরিখে তৎকালীন বি এন পি সরকার দেশের আইন শৃখলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা এবং সন্ত্রাস দমনের জন্য স্বল্পমেয়াদী ” অপারেশন ক্লিনহার্ট ” নামে একটি সংস্থা তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার দেশে অভ্যন্তরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুলোর সমন্বয়ে RAB নামক সংস্থার পরিচালিত অভিযানে “ক্রসফায়ার – এনকাউন্টার ” নামের বিচারবহির্ভুত হত্যার প্রচলন ঘটে। দেশে বিদেশে মানবাধিকার সংস্থা কিম্বা সংগঠনগুলো সেই সকল বিচারবহির্ভুত হত্যাকাল্ডকে ( Extrajudicial Killing ) হিসাবে চিহ্নিত করে থাকে। আইনবহির্ভুত হত্যাকান্ডের নামে এটি দেশে বিদেশে বেশ বিতর্কের কারন হয়ে পড়েছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে দেশে সুস্থ ও নিরাপদ আইন শৃখলা পরিস্থিতি তৈরীর মাধ্যম ক্রসফায়ার কিম্বা এনকাউন্টার নয়। প্রয়োজন দেশে যথাযথ আইনি ব্যাবস্থা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি প্রয়োজন আইন শৃখলা রক্ষাকারী রক্ষাকবচ পুলিশ বিভাগের প্রতিটি কর্মচারী ও কর্মকর্তা কে আপাদমস্তকে দেশপ্রেমী হিসাবে তৈরী করা। দেশের টপ টু বটম সুস্থ ও শান্তিময় আইন শৃখলা পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠিত করতে হলে চাই দেশে দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ বিভাগের কোনই বিকল্প নেই।
দ্রুভ তারার মত সত্য যে ” পুলিশ হলো শান্তির প্রতিক এবং ” পুলিশ জনগনের বন্ধু”
তাই বলবো জনাব আইজিপি মহোদয় ও দেশের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের উর্ধতন মহল থেকে নিম্নমহল পর্যন্ত কি ভাবে দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ বিভাগকে ডেলে সাজিয়ে জনগনের সত্যিকারের আদর্শবান বন্ধু হিসাবে গড়ে তোলা যায় তা নিয়ে স্ব স্ব মেধা আর প্রজ্ঞা স্বচেষ্ট হয়ে পুলিশ ও জনগন দুই মিলে একটি বন্ধুর ভীত তৈরী করুন। নয় সংঘাত , নয় ক্রসফায়ার এবং নয় এনকাউন্টার । আর দেশের জনগন যেন না বলে – “পুলিশ তুমি কার ” ?
হাঁ , এর জন্য প্রয়োজন সরকারে সৎ ইচ্ছা। ও শতভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি পুলিশ বিভাগ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় ।
” নজরুল ইসলাম চৌধুরী “
কলামিষ্ট ও লেখক
সাবেক সভাপতি – ফেনী জেলা জাতিয়তাবাদী ছাত্রদল













