বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নিজস্ব মডেল তৈরির পরিকল্পনা করছে সরকার। এ জন্য দেশেই শক্তিশালী কম্পিউটার ও সার্ভারের অবকাঠামো গড়ে তুলতে চায়। লক্ষ্য হলো, দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেশের ভেতরে রেখেই এআই তৈরি ও ব্যবহার করা। উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশ্বের শীর্ষ চার প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাদের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তারাও এই অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
সরকারে পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে জাতীয় ডেটা সেন্টারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে দেশের মূল এআই অবকাঠামো। সারা দেশে থাকবে আটটি আঞ্চলিক কেন্দ্র। জাতীয় ডেটা সেন্টারটি বর্তমানে বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল) পরিচালনা করছে। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গাজীপুরে প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে।
কালিয়াকৈরের বাইরে দেশের আট বিভাগে আটটি আঞ্চলিক এআই কম্পিউটিং নোড স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এর ফলে বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থানীয়ভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুযোগ পাবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সার্বভৌম এআইয়ের মূল কথা হলো, দেশের নাগরিকদের তথ্য, ডেটা ও নাগরিক সেবার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে এআই প্রযুক্তির সুফল যেন সমাজের নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে রিকশাচালকের সন্তান পর্যন্ত সবাই পায়, সেটি নিশ্চিত করা।’
রেহান আসিফ আসাদ বলেন, দেশে বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) উন্নয়নের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যুক্ত করে গবেষণা ও উন্নয়নের একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা হবে। জাতীয় অবকাঠামো তৈরি হলে এর কম্পিউটিং সক্ষমতা দেশের বেসরকারি খাত ও স্টার্টআপগুলোর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
বাংলা ভাষায় এআই মডেল
সরকারের পরিকল্পনায় জেমা, লামা ও কুয়েনের মতো বিদ্যমান এআই মডেলকে বাংলা ভাষার উপযোগী করে তোলার কথা বলা হয়েছে। এ জন্য বাংলা লেখা ও তথ্য দিয়ে মডেলগুলোকে আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রযুক্তির ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ফাইন টিউনিং। পাশাপাশি বাংলায় কথা থেকে লেখা তৈরি, অনুবাদ ও শিক্ষাসহায়তার কাজে এআই ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। মডেলের প্রশিক্ষণ ও ব্যবহার—দুই কাজই দেশের ভেতরের অবকাঠামোয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, উদ্যোগ শুরুর প্রথম ১২ মাসে এআই কম্পিউটার সংযোজনের প্রস্তুতি, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ছোট আকারের এআই ব্যবস্থা স্থাপন এবং কালিয়াকৈরের অবকাঠামোর কারিগরি সমীক্ষা করার কথা রয়েছে। ১২ থেকে ২৪ মাসের ধাপে বিভাগীয় কেন্দ্র চালু এবং প্রথম এআই মডেল প্রশিক্ষণের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এরপর ২৪ থেকে ৩৬ মাস বা তার বেশি সময়ের ধাপে জাতীয় কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপগুলোর জন্য ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নিজেদের এআই কেন
চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাইয়ের মতো এআই সেবা এখন গবেষণা ও পেশাগত নানা কাজেও সহায়তা করছে। কোনো বিষয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য খুঁজে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি, একাধিক গবেষণাপত্রের বক্তব্য তুলনা এবং দীর্ঘ নথি বিশ্লেষণে এগুলো ব্যবহার করা যায়। সফটওয়্যার তৈরির ক্ষেত্রেও এসব এআই কাজে লাগছে। এসব কাজের অনেকগুলো করতে আলাদা টাকা খরচ করতে হয় না। তাহলে এসব সেবা থাকতে বাংলাদেশকে আলাদা এআই অবকাঠামো তৈরি করতে হবে কেন।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এআই প্রযুক্তি চালানোর জন্য শুধু সফটওয়্যার থাকলেই হয় না; প্রয়োজন শক্তিশালী কম্পিউটার, প্রসেসর, সার্ভার ও বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা। এআইকে কোনো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া কিংবা একসঙ্গে অনেক মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যও এই কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন। সরকার সেই অবকাঠামো দেশেই তৈরি করতে চায়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্বভৌম এআইয়ের সক্ষমতা নির্ভর করবে এআই মডেলের মান, প্রয়োজনীয় তথ্য, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর। আর দেশে সার্ভার থাকলেই তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এ জন্য কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও তথ্য ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকতে হবে।
টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ প্রধান ফৌজিয়া আফরোজ প্রথম আলোকে বলেন, শুধু নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তোলাই যথেষ্ট নয়; এর নিরাপত্তা, নাগরিকের অধিকার, আইনি সুরক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে তথ্য লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহির ঘাটতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। এখানে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালার বিষয়টি পরে বিবেচনা করা হয়। ফলে তথ্য লঙ্ঘনের ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর মতে, তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি তাই কার্যকর নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যথাযথ বোঝাপড়া জরুরি।
টেশিসকে কাজে লাগাতে চায় সরকার
সার্বভৌম এআই উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য হলো, বিদেশ থেকে সব ধরনের প্রস্তুত যন্ত্রপাতি আমদানি না করে দেশেই কিছু যন্ত্রপাতি সংযোজন করা। এ জন্য গাজীপুরের টঙ্গীতে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) বিদ্যমান কারখানা ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুরুতে ছোট আকারের এআই কম্পিউটার সংযোজন করা হবে। পরে উচ্চক্ষমতার ওয়ার্কস্টেশন, সার্ভার ও সম্পূর্ণ সার্ভার র্যাক সংযোজনের সক্ষমতা তৈরি করা হবে। তবে সব যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে তৈরি হবে না। বিশেষ করে উচ্চক্ষমতার প্রসেসর, মেমরিসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রযুক্তি বিদেশ থেকে আনতে হবে।
প্রাথমিকভাবে সম্পূর্ণ তৈরি যন্ত্রপাতি আমদানি করে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় কারখানা প্রস্তুত করা হবে। পরের ধাপে বিদেশ থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এনে দেশে সংযোজন ও পরীক্ষা করা হবে। আরও পরের ধাপে সার্ভারের বিভিন্ন অংশ সংযোজন, যন্ত্রপাতির মান যাচাই ও মেরামতের সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে।
বিদেশি প্রযুক্তিসেবার দেশীয় বিকল্প তৈরির ঘোষণা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক ফেসবুকের বিকল্প ‘যোগাযোগ’ তৈরির কথা জানান। জুমের বিকল্প ‘বৈঠক’ এবং হোয়াটসঅ্যাপের বিকল্প ‘আলাপন’–এর কথাও বলেছিলেন। আবার ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এআইভিত্তিক ‘জি–ব্রেইন’ প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করে সেটি জাতীয় ডেটা সেন্টারে নেওয়া এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে সম্প্রসারণের কথা বলা হয়।
তবে ঘোষণার পর কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে আর উদ্বোধনের সেসব সেবা কতটা কাজে লেগেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যোগের ব্যয়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশি প্রযুক্তিসেবার বিকল্প তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, সেগুলো যেন ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন মেটাতে পারে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তিসেবা ছেড়ে কোন বাড়তি সুবিধার কারণে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, সেটিও পরিষ্কার থাকতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগে শুধু নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি বা উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; সেবার মান, নিরাপত্তা, ব্যবহারকারীর আগ্রহ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যথা বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি এসব উদ্যোগ একসময় ব্যবহারকারীর অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।












