জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি:সংগৃহীত
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রকাঠামো, গণমাধ্যম ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।
সোমবার দুপুরে দৈনিক যুগান্তর আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে তারা এই মতামত দেন।
যুগান্তর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিশিষ্টজনরা আরও বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাকে কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক বয়ানে সীমাবদ্ধ না রেখে এর আত্মত্যাগ, গণসম্পৃক্ততা এবং জনগণের প্রত্যাশা সামনে রেখে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করতে হবে।
একই সঙ্গে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান তারা। আলোচনা শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন যুগান্তর সম্পাদক কবি ও গবেষক আবদুল হাই শিকদার।
এর আগে আলোচকের বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্ বলেন, ২০২৪ বিপ্লব নয়, ছিল গণ-অভ্যুত্থান। গণ-অভ্যুত্থানের পর শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; পুরোনো রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা। এ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সার্বভৌমত্বের পক্ষে থাকা শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে মাহবুব উল্লাহ্ বলেন, একসময় যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক একমেরু বিশ্বব্যবস্থা থাকলেও চীনসহ বিভিন্ন শক্তির উত্থানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের চীন ঠেকাও নীতির প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ছে। তিস্তা প্রকল্প, বাংলাদেশ-মিয়ানমার যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা, মোংল্লা বন্দর ও চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন বিষয়ে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশকে ‘এক পাশে হাঙর, অন্য পাশে কুমির’ রেখেই সাঁতার কাটতে হবে।
শিক্ষা ঠিক না করলে রাজনীতিও ঠিক হবে না
লেখক, গবেষক ও চিন্তক অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক না করলে রাজনীতিও ঠিক করা সম্ভব নয়। শিক্ষা ও ভাষানীতিতে মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ইংরেজির প্রয়োজন থাকলেও প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষায় বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে একাধিক শিক্ষা কমিশন হলেও কাঙ্খিত পরিবর্তন আসেনি। প্রাথমিক শিক্ষা কত বছর হবে, কোন পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শাখায় ভাগ করা হবে- এসব বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও গবেষণার ক্ষেত্রেও দেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক কাঠামোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক ও বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ওপর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় অংশ নির্ভরশীল। দেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে রাষ্ট্রকে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। মানুষ শুধু মুখ নিয়ে জন্মায় না, দুটি হাত নিয়েও জন্মায়। সেই মানুষের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে বড় সিদ্ধান্ত জরুরি
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনীতি অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকিং খাত, বিমা, পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। উচ্চ সুদহার, করের চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাত নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে। দ্রুত বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।
দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও নতুন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। যেখানে বিনিয়োগ করলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে, সেখানে অর্থ ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অর্থনৈতিক সংকটের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে আবু আহমেদ বলেন, অর্থনীতি আরও খারাপ হলে দারিদ্র্য ও মানুষের অসন্তোষ বাড়বে। এর সুযোগ নিয়ে অতীতের কর্তৃত্ববাদী শক্তি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
৭১ ও ২৪-এর তুলনা অর্থহীন
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের মধ্যে কোনটি বড়-এ বিতর্ক অর্থহীন। দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আবেগ আল্লাদা এবং উভয়ের নিজস্ব ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ২০২৪-এর তরুণ প্রজন্মের কাছে ২৪-এর আবেগ প্রধান, আবার যারা ১৯৭১ দেখেছেন তাদের কাছে ৭১-এর আবেগ অটুট।
তিনি বলেন, এ অঞ্চলের অন্যান্য আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের নানা রাজনৈতিক অভিঘাত রয়েছে। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা ও নিজস্ব প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হবে।
নাগরিক সমাজের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রাণ হলো নাগরিক সমাজ। অথচ বিগত সময়ে সিভিল সোসাইটিকে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। একই সঙ্গে অকার্যকর সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক অপচয় কমানোর আহ্বান জানান তিনি।
জুলাইয়ের বয়ান তৈরিতে গণমাধ্যমের দায়িত্ব
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বয়ান তৈরি ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। জুলাইয়ের পর রাষ্ট্র ও সমাজ কোন পথে এগোবে, সে বিষয়ে সক্রিয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তার পরিসর তৈরি করতে হবে।
তা না হলে অভ্যুত্থানকে ঘিরে নানা কল্পকাহিনি ও বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, একটি সংবাদপত্র শুধু সংবাদ পরিবেশন করবে না; জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো চিহ্নিত করে জনগণের সামনে তুলে ধরবে।
দলীয় অবস্থান থেকে রাজনৈতিক দলগুলো যে বিষয়গুলো দেখতে পায় না, গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের সেগুলো দেখার চেষ্টা করতে হবে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনাকে কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তিতে পরিণত করা যাবে না।
ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির তাগিদ
সাংবাদিক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা আবু রুশদ বলেন, বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নতজানু হয়ে পড়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তাদের এই অবদান জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে স্থান পেতে পারত বলেও মনে করেন তিনি।
রাষ্ট্র সংস্কারে সময় প্রয়োজন
যুগান্তরের নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদীন বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা, আইনি সংস্কার ও সামাজিক পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। বিরোধী অবস্থানে থেকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য বা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর মতো প্রস্তাব দেওয়া সহজ হলেও ক্ষমতায় গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির কারণে সবকিছু একসঙ্গে পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, সংবিধান বা আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের আইন মানার প্রবণতা, নাগরিক সচেতনতা ও সামাজিক আচরণেরও পরিবর্তন প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও সমাজের সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন যুগান্তরের উপসম্পাদক দেওয়ান আসিফ রশীদ, বার্তা-সম্পাদক জোহায়ের ইবনে কলিম, নগর সম্পাদক মিজান মালিক, বিশেষ প্রতিবেদক কাজী জেবেল, সম্পাদকীয় ও ফিচার বিভাগের প্রধান মো. হাসান শরীফ প্রমুখ।












