শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ইজারা চুক্তি হতে পারে আগামী ৮ অক্টোবর এমনটাই খবর পেয়েছেন শ্রমিক নেতারা। তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, চুক্তি হলে সেদিন সঙ্গে সঙ্গে বন্দর অচল করে দেওয়া হবে। এখানেই শেষ নয়, বন্দরের আরও তিন টার্মিনাল নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠান। এগুলো বাস্তবায়ন হলে বন্দরের সব টার্মিনাল চলে যাবে বিদেশিদের হাতে।
এনসিটি-সিসিটি ইজারা বাতিলের দাবিতে গতকাল সোমবার অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি। তাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কর্মসূচিতে অংশ নেয় শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। বেলা ১১টা থেকে বন্দর ভবনের সামনের সড়কে এ কর্মসূচি শুরু হয়। দিনব্যাপী কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও শ্রমিক নেতারা সেটি দুপুর ১টায় শেষ করেন।
কর্মসূচি চলাকালে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন এনসিটি ইস্যুতে এক বিস্ফোরক তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, আগামী ৮ অক্টোবর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি হতে পারে বলে তারা শুনেছেন। তার কথা শেষ হতেই শ্রমিকরা ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। তখন তিনি বলেন, যদি তাই হয়, তাহলে চুক্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তিনি সরকারকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
কর্মসূচি চলাকালে শ্রমিক নেতারা বন্দর ভবনের সামনের সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। তবে বন্দরের আনসার ও পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। কর্মসূচি চলাকালে শ্রমিক নেতারা ইজারা চুক্তি ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার ইচ্ছা পোষণ করেন। পাশাপাশি কর্মসূচি থেকে আগামী ৭ অক্টোবর মশাল মিছিল এবং ১৩ অক্টোবর সকাল ১১টায় বন্দর চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও এবং স্মারকলিপি প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি ও বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, ক্ষমতায় এসেই যদি আপনারা শ্রমিকের বিরুদ্ধে যান, বন্দর দিতে শুরু করেন, এনসিটি দিতে শুরু করেন, তখন আমাদের কষ্ট হয়। এই এনসিটির টাকা দিয়ে পায়রা হয়, বে টার্মিনাল হয়, মাতারবাড়ী হয়, পানগাঁও হয়। এটা তো দুধেল গাই। এটা কেন কেটে খাব আমরা।
তিনি বলেন, আমরা চাই না বন্দর, এনসিটি, সিসিটি বিদেশিদের হাতে দেওয়া হোক। এই দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছি। এর আগের সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারও আমাদের আন্দোলনের কথা শুনতে বাধ্য হয়েছে। এবারও আমরা এমন আন্দোলন গড়ে তুলব–যেখানে জনগণ আমাদের সঙ্গে থাকবে। আমরা জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্নহতে দিতে পারি না।
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবের সমালোচনা করে বন্দর শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের নেতা তপন দত্ত বলেন, প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন দেশে পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে লাভজনক এনসিটি কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হবে এটাই তাদের মূল প্রশ্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যান ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্বার্থে কাজ করছেন বলে আশঙ্কা রয়েছে। বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার জন্য তিনি (বন্দর চেয়ারম্যান) মরিয়া হয়ে উঠেছেন। আমি বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। পাশাপাশি আমাদের চলমান আন্দোলন কোনোভাবেই সরকারের বিরুদ্ধে নয়। যারা সরকারকে ভুল বুঝিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করছে, আমাদের আন্দোলন তাদের বিরুদ্ধে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, সম্প্রতি কিছু ব্যক্তি ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বন্দর ইজারা দেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছেন। বন্দর পরিচালনা ও এর বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে না জেনে কেবল বিদেশি বিনিয়োগের যুক্তিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ইজারা দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
বন্দরের তিন টার্মিনাল চায় এক বিদেশি প্রতিষ্ঠান
চট্টগ্রাম বন্দরের সাত টার্মিনালের মধ্যে পতেঙ্গা, লালদিয়ার চর ও পানগাঁও আইসিডি এই তিন টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ আগেই দেওয়া হয়েছে। গত ১ অক্টোবর এনসিটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত খসড়া কনসেশন চুক্তির অনুমোদন দেয় সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ)। এনসিটি দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা চলছে। যেহেতু এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের স্বয়ংসম্পূর্ণ ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এটি বন্দর শ্রমিক এবং স্বয়ং বন্দর কর্তৃপক্ষ এই টার্মিনালটি লাভজনক বলে নানা সময় বিভিন্ন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে।
বন্দরের বাকি তিন টার্মিনাল অর্থাৎ চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল পরিচালনা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই)। বিদেশি এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে। এ বিষয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি হাতে পেয়েছে খবরের কাগজ।
চিঠিতে ওই তিন টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান আরএসজিটিআইয়ের আগ্রহের বিষয়ে বলা হয়েছে। চিঠির শেষদিকে এই প্রতিষ্ঠানকে চট্টগ্রাম বন্দরের সিসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় অপারেটর হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা হয়। যদিও এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং অর্থনীতিবিদরা কথা বলতে রাজি হননি।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, বর্তমানে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। চট্টগ্রাম বন্দর এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে সরকার যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।













