গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নিখোঁজ পরিবারের পাশে দীর্ঘ পথচলার স্মরণীয় দিন
বিশেষ প্রতিনিধি
আজ ১০ অক্টোবর ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি—এনডিপির মহাসচিব, মানবাধিকার সংগঠক ও সামাজিক আন্দোলনের কর্মী মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসার ৯ম কারামুক্তি দিবস। ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর শহীদ জেহাদ দিবস উপলক্ষে রাজধানীর দৈনিক বাংলা মোড়ে শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনটি তাঁর অনুসারী ও সহকর্মীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
মঞ্জুর হোসেন ঈসার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি থেকে তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনা রাজনৈতিক ও মানবাধিকার অঙ্গনে আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। কারামুক্তির পরও তিনি রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের দাবিদাওয়া নিয়ে তাঁর কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পথচলা
মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার অঙ্গনে সক্রিয়। বর্তমানে তিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি—এনডিপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান হিসেবেও বিভিন্ন মানবাধিকার ইস্যুতে বক্তব্য ও কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আসছেন।
প্রকাশ্য সংবাদ প্রতিবেদনেও বিভিন্ন সময়ে তাঁকে এনডিপির মহাসচিব কিংবা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় অবস্থায় দেখা যায়।
মানবাধিকার সংগঠক হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ডের অন্যতম ক্ষেত্র গুম, নিখোঁজ, রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্যাতন, বিচারহীনতা এবং নাগরিক অধিকার। ২০২৬ সালের একটি মানবাধিকারবিষয়ক অনুষ্ঠানে তাঁকে মানবাধিকার খাতে অবদানের জন্য স্বীকৃতি দেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
‘মায়ের ডাক’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের অধিকার ও তাদের স্বজনদের সন্ধানের দাবিতে গড়ে ওঠা ‘মায়ের ডাক’-এর সঙ্গেও মঞ্জুর হোসেন ঈসার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কথা তাঁর সহকর্মীরা উল্লেখ করেন।
‘মায়ের ডাক’ নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, আলোচনা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করেছে। ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে সংগঠনটির একটি কর্মসূচিতে ৮০টির বেশি পরিবার অংশ নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
২০১৯ সালেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা ‘মায়ের ডাক’-এর উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন এবং নিখোঁজ স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
মঞ্জুর হোসেন ঈসার ঘনিষ্ঠজনদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি মানবিক ও নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।
মানবাধিকার আন্দোলনে ধারাবাহিক ভূমিকা
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে মঞ্জুর হোসেন ঈসার অংশগ্রহণের তথ্য বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, গুম, নিখোঁজ, রাজনৈতিক হয়রানি এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে তিনি নিয়মিত বক্তব্য রেখেছেন।
২০১৩ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের অংশগ্রহণে আয়োজিত মানববন্ধনকেও তাঁর মানবাধিকার কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের দাবি—স্বজনদের সন্ধান, ঘটনার তদন্ত এবং আইনের আওতায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদেও সক্রিয়তা
২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার পরও মঞ্জুর হোসেন ঈসা প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ ও মানববন্ধনের কর্মসূচি পালনের কথা সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি গুরুত্বপূর্ণ।
‘মায়ের ডাক’ ও পাঠ্যপুস্তকের প্রসঙ্গ
‘মায়ের ডাক’-এর কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনেও আলোচনা হয়েছে। সংগঠনটির ইতিহাস ও কার্যক্রম অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যবইয়ে ‘Mother’s Call (Mayer Dak)’ শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে—এমন দাবি মঞ্জুর হোসেন ঈসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা করে থাকেন।
তবে পাঠ্যপুস্তকে কারও ব্যক্তিগত অবদান বা ছবি অন্তর্ভুক্তির মতো নির্দিষ্ট তথ্য সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্করণ ও সরকারি পাঠ্যপুস্তকের কপি দিয়ে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনীতি ও মানবাধিকারের পাশাপাশি সংস্কৃতি
মঞ্জুর হোসেন ঈসার কর্মকাণ্ড শুধু রাজনৈতিক ও মানবাধিকার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় ঐক্যভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
‘হৃদয়ে পতাকা ২ মার্চ’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, দেশপ্রেম, জাতীয় পতাকার মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত রয়েছেন বলে তাঁর সংগঠনসংশ্লিষ্টরা জানান।
এছাড়া সাংবাদিকতা ও সামাজিক সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে তাঁকে মানবাধিকার, শিক্ষা, রাজনীতি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত একজন সংগঠক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এনডিপি চেয়ারম্যানের বক্তব্য
এনডিপি চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্তজা বলেন,
“মঞ্জুর হোসেন ঈসা শুধু একজন রাজনৈতিক সংগঠক নন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। শহীদ জেহাদ দিবসের প্রেক্ষাপটে তাঁর কারামুক্তির দিনটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায়।”
মঞ্জুর হোসেন ঈসার বক্তব্য
৯ম কারামুক্তি দিবস উপলক্ষে মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা বলেন,
“কারাগারের অভিজ্ঞতা একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য যেমন কঠিন, তেমনি তা মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে নিজের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করার শিক্ষা দেয়। শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদসহ গণতন্ত্রের আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।”
তিনি বলেন, “মানুষের কথা বলার অধিকার, ন্যায়বিচারের অধিকার এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এসব কোনো দলীয় বিষয় নয়; এগুলো মানবিক ও নাগরিক অধিকার।”
একটি দিন, একটি স্মৃতি, একটি দীর্ঘ পথচলা
২০১৭ সালের ১০ অক্টোবরের কারামুক্তির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পালিত এই দিনটি মঞ্জুর হোসেন ঈসার রাজনৈতিক জীবনের একটি ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘ সামাজিক ও মানবাধিকার কর্মকাণ্ডেরও একটি প্রতীকী দিন হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রায় এক দশকের পথচলায় তাঁর কর্মকাণ্ডের পরিধি রাজনীতি থেকে মানবাধিকার, নিখোঁজ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো থেকে সামাজিক সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তাঁর সমর্থকদের কাছে ১০ অক্টোবর তাই শুধু কারামুক্তির দিন নয়; বরং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে তাঁর দীর্ঘ পথচলার একটি স্মরণীয় দিন।
৯ম কারামুক্তি দিবসে তাঁর সহকর্মী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ কর্মময় জীবন কামনা করেছেন।












