• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

স্যাংশন-ভিসা : গাজীপুরে কাতার সোজা

প্রকাশ: শনিবার, ২৭ মে, ২০২৩ ১২:৪৬
আপডেট: শনিবার, ২৭ মে, ২০২৩ ১২:৪৬

96663 8

স্যাংশন-ভিসা : গাজীপুরে কাতার সোজা

মোস্তফা কামাল

কাতার সোজা করে দাঁড়ানো নামাজের অন্যতম শর্ত। এ সংক্রান্ত বেশ কটি হাদিসও রয়েছে। কিন্তু ছোট্ট এ শর্তটি না মানার একটি প্রবণতা চলছে বরাবরই। নামাজে দাঁড়ানোর সময় ইমাম-মুয়াজ্জিন আদবের সঙ্গে কাতার সোজা করার তাগাদা দেন। কাজ হয় না। মুসল্লিদের কেউ একজন হুঙ্কার দিয়ে কয়েকটি রূঢ় ভাষা দু-চার কথা বলার পর, চোখের পলকে কাতারটি সোজা হয়ে যায়। আমাদের মসজিদগুলোতে এ চর্চা বা রেওয়াজ নিত্যদিন।

নিজ থেকে বা মিষ্টি কথায় সোজা-সিধা হওয়ার অভ্যাস আমাদের এখনো হয়ে ওঠেনি। তা সমাজ-সংসারে পরতে পরতে। রাজনীতিতে আরেকটু বেশি। গত কদিন ধরে গুঞ্জন ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা ‘ওই আসছে তেড়ে’। ঘটনা বা ভাগ্যক্রমে তা আসেনি। শুধু বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতিমালার ঘোষণা এসেছে। কেউ খুশিতে আটখানা, কেউ বেজার। উল্টাপাল্টা কথা। পরক্ষণে আবার সুবোধ। সবার মুখে প্রায় এক কথা। এক কাতার হয়ে চলে যাচ্ছেন বিদেশি ময়মুরুব্বির কাছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের দরবারে আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির নেতারা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কী মিষ্টি-মধুর দীর্ঘ বৈঠক। একসঙ্গে বসে কত কথা, খোশ আলাপ। কাছাকাছি সুর। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতির সঙ্গে তারাও একমত বলে কোরাস সুরে জানান। ঠিকঠিক বলে হুক্কাহুয়া আওয়াজ। মি. হাসের জন্যও বিনোদিত হওয়ার মতো। কী ইন্টারেস্টিং! কোন মানের সার্কাস!


আমেরিকা ভিসা রেসট্রিকশন নীতি এই কথা বলে না, বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে বা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না। তবে নতুন ভিসা নীতির ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চার ধরনের কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১. ভোট কারচুপি; ২. ভোটার ইনটিমিডেশন; ৩. সহিংসতার মাধ্যমে জনগণের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘন এবং ৪. রাজনৈতিক দল, ভোটার, নাগরিক সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের মতপ্রকাশের অধিকার হরণ। ১ ও ২ প্রযোজ্য হবে নির্বাচনের সময়। ৩ ও ৪ এখন থেকেই বলবৎ। কে জিতেছে, কে হেরেছে, কীভাবে জয়-পরাজয় ঠিক হয়েছে—সেটি আরেক বিষয়। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে তার কিছুটা জের এরই মধ্যে পড়েছে। রাজনীতির ভেতরের খবর জানা ব্যক্তিরা তা আঁচ করছেন। মঞ্চে বা বটতলায় নানা খিঁচুনি, বড় বড় কথা, রঙ্গব্যঙ্গ, আবৃত্তির ডায়ালগ ছাড়লেও সময়দৃষ্টে নানান জায়গায় কুর্নিশ বা নেতিয়ে পড়ায় লাজশরমের বালাই কোনোকালেই ছিল না এবং নেই আমাদের কথিত বরেণ্য মহাশয়দের। আবার কথার তেজ থামান না। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি নিয়েও তা করছেন। কেউ বলার চেষ্টা করছেন ‘ভিসা রেসট্রিকশন’ আর ‘স্যাংশন’ এক জিনিস নয়। কারণ ‘ভিসা রেসট্রিকশন’ দেয় ‘ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট’, আর ‘স্যাংশন’ দেয় ‘ডিপার্টমেন্ট অব ট্রেজারি’। যুক্তির কী তেজ! আবার কেউ বলতে চান ভিসা রেসট্রিকশন স্যাংশনের চেয়েও কড়া। নয়া ভিসা নীতিটির বহুমাত্রিকতা রয়েছে। রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত এ পদক্ষেপের আওতায় পড়বে।


মূল বিষয়ের ধারেকাছে না গিয়ে নিজেকে বেশি লাভবান, প্রতিপক্ষকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভাবার একটি সমীকরণ মেলানোর ধুম চলছে। জাতিসংঘের মতো যুক্তরাষ্ট্র এতদিন বলেছিল, তারা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের অপেক্ষা করছে। এখন আর নরম কথার অপেক্ষার পর্যায়ে নেই। অ্যাকশন বা থেরাপি প্রয়োগে নেমে গেছে দেশটি। কথা একটু পাল্টে জানিয়ে দিয়েছে, যারা সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা দেবে তাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদেরও যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দেবে না। অনেকটা বজ্রপাতের মতো কীসের মধ্যে কী ধরনের এক অবস্থা। তাৎক্ষণিক জবাবে বাংলাদেশ থেকে বলা হয়েছে, সরকার এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। এসবে বদার করার কিছু নেই। আসলেই বদার না করা বা মাথা না ঘামানোর মতো বিষয়টি? সরকারের দিক থেকে এতে বিচলিত না হওয়ার ভান করলেও ভেতরের অবস্থা নিশ্চিন্ত থাকার মতো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা খুব স্পস্ট। গত কদিন ধরে ঘুরছিল বাংলাদেশের আরও কয়েকজনের স্যাংশনে পড়ার গুঞ্জন। বাস্তবে প্রকাশ পেল যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতির খবর। বাংলাদেশ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র কতটা কঠোর অবস্থানে তা বোধগম্য ভিসা নীতি একযোগে তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজে টুইট করা, সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে এবং দূতাবাসের মাধ্যমে ঘোষণার মধ্যে। কারও ওপর শুধু ভিসা রেসট্রিকশন দিলে সে ওই দেশে ঢুকতে পারবে না। কিন্তু কারও ওপর ম্যাগনেটস্কি অ্যাক্টে স্যাংশন দিলে, সে ওই দেশে ঢুকতে তো পারবেই না, সঙ্গে সঙ্গে ওই দেশে থাকা তার সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। তার ভিসা ও মাস্টারকার্ড এফিলিয়েটেড ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড বাতিল হয়ে যাবে। এ দুই কার্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ যে কোনো দেশের কোনো ব্যাংকে সে অ্যাকাউন্ট রাখতে পারবে না। তার মানে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য দেশে গেলেও তাকে ক্যাশ টাকা দিয়ে সব কাজ করতে হবে। অর্থাৎ ‘ভিসা রেসট্রিকশন’ আর ‘স্যাংশন’ এক জিনিস নয়। ভিসা দেওয়া, না দেওয়া নিয়ে আমেরিকার হুমকির জেরের কিছুটা ছায়া পড়েছে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে। মার্কিন নতুন ভিসা নীতির জের বা তোলপাড়ের কারণে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ভেতরের ঘটনা অনেক তলিয়ে গেছে। গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে বিশ্লেষণ চলবে কদিন। স্থানীয় নির্বাচন হলেও সেখানে জাতীয় রাজনীতির পরাজয় দৃশ্যমান। এরপরও বলতে হবে গাজীপুরের পৌর নির্বাচনে সেখানকার মানুষের ইচ্ছা জয়ী হয়েছে। মানুষের পছন্দ বিজয়ী হয়েছে। একজন সাধারণ গৃহিণীর কাছে সিজনড পলিটিশিয়ানের পরাজয়কে সাদামাটাভাবে কিংবা নানা অজুহাত দিয়ে খাটো করার চেষ্টা করলেই বাস্তবতা ভিন্ন হয়ে যায় না, যাবে না। সরকার মনোনীত প্রার্থীকে গাজীপুরের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি সরকারের পরাজয়, আবার জয়ও হয়েছে। যার মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক ব্যাখ্যা। সরকার নিশ্চয়ই সেই সুযোগটি হাতছাড়া করবে না।

অবস্থা মালুম করে শুধু এক কাতারবদ্ধই হচ্ছে না। সুরও বদল হচ্ছে দলে দলে, জনে জনে। বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অব্যাহত অঙ্গীকারের প্রতি জোরালো সমর্থনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা করেছে সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতির বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তারা (যুক্তরাষ্ট্র) বলেছে নির্বাচনে বাধা দিলে ভিসা নয়। আমাদেরও এটা কথা, এ নির্বাচনে যারা বাধা দেবে, আমরাও তা চাই। বাংলাদেশে ভোটের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের এমন হস্তক্ষেপ দেশের জন্য কতটা অপমানের—এ প্রশ্নের সঙ্গে নতুন এ ভিসা নীতি যে বাংলাদেশের জন্য কতটা সতর্কবার্তা তা জানা-বোঝার সময় সামনে আরও বাকি। যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নানা অজুহাতে বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচারী শক্তিকে মদত দেয়, আবার কাজ শেষে ছুড়ে ফেলে—এমন অভিযোগের পাশাপাশি তাদের হস্তক্ষেপের প্রতি অপেক্ষমাণ মহলও প্রচুর। সামনে আরও কতজন, কত মহল এক কাতারে দাঁড়াবে সময় নিয়ে অপেক্ষা করে দেখার বিষয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলই এটিকে একে অন্যের জন্য সতর্কবার্তা বলে প্রচার করছে। জাতীয় পার্টি আছে ফাঁকতালে। তারাও বিএনপির সুরে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে সরকারি মহলসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক ধরনের জিজ্ঞাসা ও অস্বস্তি কাজ করছে। এর প্রভাব কী হতে পারে, নিজেরা কেমন আক্রান্ত হতে পারেন—এবিষয়ক খোঁজখবর নিচ্ছেন। নতুন ভিসা নীতিতে বলা হয়েছে, ভিসা বিধিনিষেধ আরোপের শিকার হবেন বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারপন্থি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং আইনপ্রয়োগকারী, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। এর মাধ্যমে সিকিউরিটি সার্ভিস বা নিরাপত্তা বাহিনীসহ দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন ও নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্ভাব্য ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত করে শক্ত বার্তা দেওয়া হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতায় এ মহলটি মনে করে, মাঝখান দিয়ে কিছু লোক বলির পাঁঠা হবে। স্যাংশন, ভিসা রেসট্রিকশন নীতি এবং আন্তর্জাতিক চাপ যে দল সফলভাবে বিনিয়োগ/মোকাবিলা করবে, তারাই শেষ হাসি হাসবে।

লেখক : কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫( লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com