জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঢাকাসহ দেশের তিন শহরে বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন কওমিপন্থি বিভিন্ন ইসলামি দলের নেতারা। তবে নারীদের ভারী যানবাহন চালকের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। অন্যদিকে এ সেবা যাতে অতীতের মতো কয়েকদিন পর বন্ধ হয়ে না যায়, সে বিষয়ে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা সুলতান মহিউদ্দীন।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির উদ্যোগে ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’ চালু করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া শহরে ১৩টি রুটে মোট ১৪টি বাস দিয়ে এ সেবা চালু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি বাস চলবে। বাসগুলো নারী চালক ও কন্ডাক্টরদের মাধ্যমে পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব বাসে ই-টিকিটিং, সিসি ক্যামেরা ও জিপিএসের সুবিধাও রাখা হয়েছে।
এই উদ্যোগ নিয়ে কালবেলার সঙ্গে প্রতিক্রিয়ায় ইসলামি দলগুলোর নেতারা মূলত নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের জন্য পৃথক পরিবহন ব্যবস্থাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। পাশাপাশি নারী চালকদের দায়িত্ব, কর্মজীবী নারীদের কর্মপরিবেশ এবং সেবাটি দীর্ঘমেয়াদে চালু রাখার বিষয়েও মত দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক পৃথক পরিবহন ব্যবস্থাকে নারীদের জন্য নিরাপদ মনে করলেও ভারী যানবাহন চালানোর দায়িত্ব নারীদের দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য আলাদা পরিবহন সার্ভিসকে আমরা তাদের জন্য নিরাপদ মনে করি। তবে ভারী গাড়ি চালানোর মতো দায়িত্ব নারীদের দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করি। কারণ, এত বড় গাড়ি চালানো (ঝুঁকিপূর্ণ) নারীদের পক্ষে কতটা উপযুক্ত হবে, সে বিষয় নিয়ে আমাদের কানসার্ন আছে।’
তবে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সুলতান মহিউদ্দীন পৃথক পরিবহন ব্যবস্থার ফলে নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরার পাশাপাশি সেবাটি দীর্ঘমেয়াদে চালু রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য পৃথক পরিবহন ব্যবস্থা চালুকে সাধুবাদ জানাই। এ উদ্যোগের ফলে কর্মজীবী নারী, পর্দানশিন নারী ও মেয়ে শিক্ষার্থীরা ভিড়ভাট্টা ও গণপরিবহনে হয়রানি থেকে মুক্ত হয়ে নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন। তবে অতীতের মতো এবারও কয়েকদিন চালু থাকার পর যেন এ সার্ভিস বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য যথাযথ উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে।’
এদিকে কর্মজীবী নারীদের জন্য পৃথক পরিবহন ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি অফিস-আদালতেও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমি। তিনি বলেন, ‘এদেশে নারীদের যাতায়াতের জন্য গণপরিবহনের অনেক সমস্যায় আমরা বিভিন্ন সময় লক্ষ্য করেছি। কর্মজীবী মা-বোনদের জন্য পৃথক বাহনের ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসার দাবিদার। আমরা মনে করি, সর্বক্ষেত্রে নারীদেরকে তাদের কাজের সম্মানজনক ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অফিস আদালতেও তাদের পৃথক সম্মানজনক ব্যবস্থা করা দরকার।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দিও পৃথক পরিবহন ব্যবস্থাকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য পৃথক পরিবহন ব্যবস্থা একটি সুন্দর উদ্যোগ। আমরা সব জায়গায় নারীদের জন্য সম্মানজনক ব্যবস্থা চাই।’
জমিয়তের মতোই নারীদের জন্য পৃথক পরিবহন ব্যবস্থাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ইসলামী ঐক্যজোট। দলটির মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী বলেন, ‘নারীদের জন্য আলাদা পরিবহন সার্ভিসের উদ্যোগ চমৎকার ও প্রশংসনীয়।’
এ ছাড়া নারীদের জন্য নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার যেকোনো উদ্যোগকে আধুনিক ও সভ্য ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব প্রকৌশলী মুহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, ‘নারীদের জন্য যেকোনো স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাকে সাধুবাদ জানায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এটা সভ্যতার অংশ।’
বিআরটিসি জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া শহরে ১৩টি রুটে ১৪টি বাস নিয়ে মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি বাস পরিচালিত হবে। ঢাকার নির্ধারিত রুটগুলোতে বাসগুলো মোট ১৬০টি স্টপেজে যাত্রীসেবা দেবে। অন্যদিকে চট্টগ্রামে ১২টি এবং বগুড়ায় ১৬টি স্টপেজ নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারী যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের পাশাপাশি এই বাসে দায়িত্ব পালনকারী নারী চালক ও সহকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বাসগুলোতে সিসি ক্যামেরা ও জিপিএস প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু থাকায় যাত্রীরা বাসে ওঠার আগেই টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ বলেন, মহিলা বাস সার্ভিসে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে নারী যাত্রীরা বাসে ওঠার আগেই সহজে টিকিট সংগ্রহের সুযোগ পাবেন। এতে কাউন্টারে অপেক্ষা করার সময় যেমন কমবে, তেমনি গণপরিবহনে প্রযুক্তিনির্ভর সেবাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য শুধু বাসের ভেতরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তার মতে, নারী যাত্রীরা বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময় এবং গন্তব্যে পৌঁছে বাস থেকে নামার সময়ও যাতে নিরাপদ পরিবেশ পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই মহিলা বাস সার্ভিসকে শুধু উদ্বোধনী কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত পরিচালনার পাশাপাশি সেবার মান ধারাবাহিকভাবে উন্নত করতে হবে। তিনি আরও জানান, নারী-বান্ধব পরিবেশে এবং নারী চালকদের মাধ্যমে পরিচালিত এ ধরনের বাসসেবা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী। এসব বাসের মধ্যে ১০০টি বাস নারীদের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন রুটে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য বিভাগেও নারীবান্ধব বাসসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে চালু হওয়া এই সেবা নিয়মিত ও টেকসইভাবে পরিচালনা করা, সেবার মান বজায় রাখা এবং ধাপে ধাপে এর পরিধি বাড়ানোই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।













