• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

মতামত

পুতিন যে কৌশলে ট্রাম্পকে কাজে লাগিয়েছেন

প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ১০:৩১
আপডেট: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ১০:৩১

পুতিন যে কৌশলে ট্রাম্পকে কাজে লাগিয়েছেন
 

ভ্লাদিমির পুতিন দীর্ঘমেয়াদি ছক কষে খেলেন। কয়েক দশক ধরে তিনি ইউক্রেনকে নিজের অধীনে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি বহু বছর ধরেই তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছেন।

এখন সেই দ্বিতীয় প্রচেষ্টার সাফল্য পুতিনকে প্রথম ক্ষেত্রের ব্যর্থতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে প্রায় পাঁচ বছর ধরে রাশিয়ার লক্ষ্য ভেস্তে যাওয়ার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন তাঁকে জয়ের মুখ দেখতে সাহায্য করছেন।

রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে, ইউক্রেনে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা ছাঁটাই করে, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান ব্যাহত করে এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে পুতিনের যুদ্ধের শর্তগুলো মেনে নিতে চাপ দিয়ে ট্রাম্প রাশিয়ার জন্য ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল এবং কিয়েভের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তগুলোয় কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করছেন।

ইউক্রেনে পুতিনের পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে রণক্ষেত্রের চিত্র বারবার বদলেছে। শুরুতে রুশ বাহিনীর দাপট ছিল বেশি। কিন্তু ২০২২ সালের শরতের মধ্যে ইউক্রেন পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে রুশ বাহিনীর দখলে থাকা এতটাই এলাকা মুক্ত করে যে ইউক্রেনীয়দের এই অগ্রগতি ঠেকাতে পুতিন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন বলে ওয়াশিংটন আশঙ্কায় পড়েছিল।

এরপর যুদ্ধটি এক বিষাদময় স্থবিরতায় রূপ নেয়—গত বসন্ত পর্যন্ত যা বহাল ছিল। কিয়েভ যখন রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের ভেতরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম নতুন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, পূর্ব ইউক্রেনের দখল করা এলাকাগুলোয় রাশিয়ার রসদ সরবরাহের পথ আক্রমণ করার মতো মাঝারি পাল্লার ড্রোন এবং ইউক্রেনীয় শহরগুলোয় রাশিয়ার হামলা রুখে দেওয়ার মতো উন্নত ইন্টারসেপ্টর ড্রোন মোতায়েন করল, তখন ইউক্রেনের পক্ষে মোড় ঘুরতে শুরু করে।

পুতিনের সেনাবাহিনী সামনের সারিতে এগোতে পারছিল না, বরং ইউক্রেনীয় বাহিনীই ধীরে ধীরে নিজেদের ভূখণ্ড মুক্ত করে এগিয়ে যাচ্ছিল।

ট্রাম্পকে ঘিরে পুতিনের দীর্ঘমেয়াদি ছক শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে। নির্দিষ্ট কোনো তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য থেকে নয়, বরং ক্রেমলিনের প্রভাব ট্রাম্পের ওপর থাকলে কোনো একদিন তা কাজে লাগতে পারে—কেজিবির এই পুরোনো কৌশল থেকেই এর উৎপত্তি। আর আজ সেই দিন এসেছে।

কিন্তু ট্রাম্পের ভূমিকা আবারও রাশিয়ার পালে হাওয়া দিয়েছে। রণক্ষেত্রের অগ্রযাত্রায় বাধা পেয়ে পুতিন এখন সাধারণ মানুষ এবং তাঁদের জীবনযাত্রার জন্য জরুরি অবকাঠামো—বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইউক্রেনীয় সমাজে আতঙ্ক ছড়ানোর কৌশল নিয়েছেন।

তাঁর আশা, অবর্ণনীয় কষ্টের মুখে পড়ে জনগণ জেলেনস্কিকে আত্মসমর্পণ করতে চাপ দেবে। রাশিয়ার হাতে বিপুল সৈন্য, বিশাল সামরিক উৎপাদনক্ষমতা এবং বেশ কিছু উন্নত অস্ত্র থাকায় পুতিন বিশ্বাস করেন যে যুদ্ধ স্থবির মনে হলেও তিনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারবেন।

ট্রাম্পের সমর্থন পুতিনের এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে যে সময় তাঁর পক্ষেই কাজ করছে। ঠিক গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা মস্কোর প্রতি সহায়তার হাত আরও বাড়িয়েছেন: নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা, রাশিয়ার ডিজেল কেনা, ইউক্রেনের ‘স্টারলিংক’ ও ‘স্টারশিল্ড’ যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা ব্যাহত করা, এমনকি জেলেনস্কিকে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার জোরালো দাবি তোলা।

জেলেনস্কি যেমনটা বলেছেন, ‘এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে যখন কিছু অংশীদার রাশিয়ার ওপর থেকে চাপ কমিয়ে দেয়, তখন তা পুতিনের মনে এই বিশ্বাসই জোরদার করে যে তাঁর লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি।’

ট্রাম্পকে ঘিরে পুতিনের দীর্ঘমেয়াদি ছক শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে। নির্দিষ্ট কোনো তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য থেকে নয়, বরং ক্রেমলিনের প্রভাব ট্রাম্পের ওপর থাকলে কোনো একদিন তা কাজে লাগতে পারে—কেজিবির এই পুরোনো কৌশল থেকেই এর উৎপত্তি। আর আজ সেই দিন এসেছে।

ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বহু বছর আগেই পুতিনের ঘনিষ্ঠ রুশ ব্যক্তিরা এই আবাসন ব্যবসায়ীর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরিতে তৎপর হন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ২০১৩ সালে মস্কোতে ট্রাম্পের সহযোগিতায় ‘মিস ইউনিভার্স’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা, যেখানে তাঁর সঙ্গী ছিলেন এমিন ও আরাশ আগালারভ।

এরপর ট্রাম্পকে জেতাতে এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে হারাতে পুতিন ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের ছক আঁকেন। হিলারি ক্লিনটনের প্রচার শিবিরের ই–মেইল চুরি করে প্রকাশ করা এবং ট্রাম্পের সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো ২০১৬ সালের ভোটের ফলাফলকে ঠিক কতটা প্রভাবিত করেছিল, তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। তবে পুতিন যে ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টা করছিলেন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

২০১৭ সালে ট্রাম্পের ওপর পুতিনের এই বিনিয়োগ কূটনৈতিক পরিবেশে ফল দিতে শুরু করে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে রুশ একনায়কের প্রতি তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।

তবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে পুতিনের প্রতি তাঁর এই প্রশংসাসূচক মনোভাব মার্কিন নীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন আনতে পারেনি। কারণ, ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দলের শীর্ষ কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে পুরোপুরি রাশিয়াঘেঁষা নীতি গ্রহণ করা থেকে বিরত রেখেছিলেন।

২০২৪ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর ক্রেমলিনের এই দীর্ঘদিনের চেষ্টার বাস্তব সুফল মিলতে শুরু করে। যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে ইউক্রেনে আমেরিকার প্রত্যক্ষ সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধের মাধ্যমে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রই ছিল ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় সমর্থক।

অন্যান্য মার্কিন পদক্ষেপও ইউক্রেনকে দুর্বল করেছে এবং রাশিয়াকে লাভবান করেছে। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ইউক্রেন কখনো ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না। গত বছর আলাস্কা সম্মেলনে তিনি পুতিনকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেন, যেখানে দুই প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনকে পূর্ব দনবাসের বাকি অংশ ছেড়ে দিতে চাপ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন (যা পুতিন ২০১৪ সাল থেকে দখলের চেষ্টা করছেন)।

পুতিনেরও বোঝা উচিত যে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের এই সুবিধা খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না। ভবিষ্যৎ কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই—তিনি ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান যা–ই হোন না কেন—ট্রাম্পের এই রাশিয়া নীতি অব্যাহত রাখবেন না।

ট্রাম্প মাঝেমধ্যেই জেলেনস্কিকে গালাগাল করেছেন; সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটেছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওভাল অফিসের এক বৈঠকে, যেখানে তিনি জেলেনস্কির কথা থামিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘অনেক কথা বলেছেন। আপনারা এই যুদ্ধে জিতছেন না…আপনাদের হাতে জেতার মতো কোনো কার্ড নেই।’

গত দুই সপ্তাহে ট্রাম্প পুতিনের যুদ্ধের পক্ষে সাহায্য আরও বাড়িয়েছেন। তিনি রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির সুযোগ দিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন, যা মস্কোকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য শত শত কোটি ডলারের জোগান দেবে।

সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, স্পেসএক্স (ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান সমর্থক, পরম মিত্র ও তাঁর প্রশাসনের প্রাক্তন কর্মকর্তা ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান) সরবরাহ করা ‘স্টারলিংক’ ও ‘স্টারশিল্ড’ যোগাযোগব্যবস্থায় ইউক্রেন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

কিয়েভ নিজেদের ড্রোন পরিচালনা এবং রুশ ড্রোন ও রকেট ট্র্যাক করে প্রতিহত করতে এই দুই পরিষেবার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। নিজের নিজের প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে পুতিন ও ট্রাম্প নতুন কিছু ব্যবসায়িক চুক্তি নিয়েও আলোচনা করছেন।

পরিস্থিতি কি আবার ঘুরতে পারে?
ইউক্রেনীয়রা আশা হারাচ্ছে না, জনমত জরিপ অনুযায়ী, এখনো এক বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করেন, তাঁদের দেশের লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিত। ইউরোপীয় দেশগুলোও ইউক্রেনের পাশ থেকে সরছে না।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে আমেরিকান সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ হয়ে গেলে ইউক্রেন দ্রুত ভেঙে পড়বে বা আত্মসমর্পণ করবে বলে পুতিন আশা করেছিলেন। কিন্তু আমেরিকার অনুপস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলো যে এভাবে শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে আসবে, তা পুতিন ভাবতেই পারেননি।

উপরন্তু ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দ্রুত গতিতে আসা ‘গেরান ৫’ ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য নতুন অস্ত্র তৈরিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে পরিস্থিতি হয়তো রাশিয়ার অনুকূলে হেলে পড়েছে, কিন্তু অতীতেও ইউক্রেনীয়রা সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে আবারও শক্ত অবস্থান ফিরে পেয়েছিল; এবারও তারা তা করতে পারে।

বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মার্কিন নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। আমেরিকান সমাজ ট্রাম্পের পুতিনপ্রীতি এবং ইউক্রেনকে ত্যাগ করার বিষয়টি মেনে নিচ্ছে না, যার ফলে প্রশাসনের পক্ষে এই নীতি বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ছে।

ডেমোক্র্যাটরা যদি সামনের সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষে জয়লাভ করে, তবে তারা তাদের প্রাপ্ত জনমতকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা-রাশিয়া ব্যবসায়িক চুক্তিগুলোর তদন্ত শুরু করতে পারে; ইউক্রেনে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা পুনরায় শুরু করতে এবং স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড পরিষেবায় বাধা দেওয়া নিষিদ্ধ করতে নতুন আইন আনতে পারে; অথবা বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আইন বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।

পুতিনেরও বোঝা উচিত যে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের এই সুবিধা খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না। ভবিষ্যৎ কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই—তিনি ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান যা–ই হোন না কেন—ট্রাম্পের এই রাশিয়া নীতি অব্যাহত রাখবেন না।

আর আগামী সপ্তাহের পর ট্রাম্প একজন ক্ষমতার শেষ প্রান্তে থাকা প্রেসিডেন্টে পরিণত হবেন, ফলে আগামী দুই বছরে রাশিয়া বিষয়ে নীতি নির্ধারণে তাঁর প্রভাব অনেকটাই কমে যাবে।

মাইকেল ম্যাকফল ফ্রিম্যান স্পোগলি ইনস্টিটিউটের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক।

ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম